পর্যাপ্ত ঘুমের উপকারি

ঘুম মানবদেহের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার এক অপরিহার্য ভিত্তি। আমাদের মেজাজ, মনোযোগ, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা থেকে শুরু করে বিপাকক্রিয়া—জীবনের প্রায় প্রতিটি দিকেই ঘুমের প্রভাব গভীর। তবুও আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় অনেকেই মানসম্মত ঘুমের গুরুত্ব উপেক্ষা করেন, যার ফলস্বরূপ উৎপাদনশীলতা কমে যায় এবং নানা স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দেয়। ঘুম কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তার উপকারিতা কী, এবং ঘুমের অভ্যাস উন্নত করতে কী করা যায়—এই আলোচনায় সেই বিষয়গুলোই তুলে ধরা হলো ।

1 min read

white cat sleeps under white comforter
white cat sleeps under white comforter

ঘুম মানবদেহের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার এক অপরিহার্য ভিত্তি। আমাদের মেজাজ, মনোযোগ, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা থেকে শুরু করে বিপাকক্রিয়া—জীবনের প্রায় প্রতিটি দিকেই ঘুমের প্রভাব গভীর। তবুও আধুনিক জীবনের ব্যস্ততায় অনেকেই মানসম্মত ঘুমের গুরুত্ব উপেক্ষা করেন, যার ফলস্বরূপ উৎপাদনশীলতা কমে যায় এবং নানা স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দেয়। ঘুম কেন এত গুরুত্বপূর্ণ, তার উপকারিতা কী, এবং ঘুমের অভ্যাস উন্নত করতে কী করা যায়—এই আলোচনায় সেই বিষয়গুলোই তুলে ধরা হলো।

ঘুমের জৈবিক প্রক্রিয়া

ঘুম একটি জটিল জৈবিক প্রক্রিয়া, যা বিভিন্ন ধাপে সম্পন্ন হয়। মূলত ঘুম দুই ধরনের—র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট (REM) এবং নন-র‌্যাপিড আই মুভমেন্ট (NREM)। NREM ঘুম চারটি ধাপে বিভক্ত, যা ধীরে ধীরে গভীরতর হয় এবং দেহকে শারীরিক পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেয়। অন্যদিকে REM ঘুমে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়; এই পর্যায়েই স্বপ্ন দেখা এবং আবেগ প্রক্রিয়াকরণ ঘটে।

রাতভর দেহ NREM ও REM ঘুমের চক্রে ঘুরতে থাকে, প্রতিটি চক্রের দৈর্ঘ্য প্রায় ৯০ মিনিট। উভয় ধরনের ঘুমই অপরিহার্য—NREM ঘুম দেহের পুনর্গঠন, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি এবং স্মৃতির সংরক্ষণে সহায়তা করে; REM ঘুম আবেগ নিয়ন্ত্রণ, শেখা এবং সৃজনশীলতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

পর্যাপ্ত ঘুমের উপকারিতা

১. রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধি

ঘুমের সময় দেহ সাইটোকাইন নামক প্রোটিন তৈরি করে, যা সংক্রমণ প্রতিরোধে সহায়তা করে এবং প্রদাহ কমায়। ঘুমের ঘাটতি রোগ প্রতিরোধক্ষমতাকে দুর্বল করে, ফলে অসুস্থ হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। পর্যাপ্ত ঘুম দেহকে দ্রুত সুস্থ হতে সহায়তা করে।

২. স্মৃতি ও মস্তিষ্কের কার্যকারিতা উন্নত

শেখা ও স্মৃতির সংরক্ষণে ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গভীর ঘুমের সময় মস্তিষ্ক নতুন তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করে এবং সেগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতিতে রূপান্তরিত করে। এর ফলে মনোযোগ, যুক্তিবোধ ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

৩. হরমোন ও বিপাকক্রিয়ার ভারসাম্য

ঘুম কর্টিসল, মেলাটোনিন, ঘ্রেলিন ও লেপটিনসহ গুরুত্বপূর্ণ হরমোন নিয়ন্ত্রণ করে, যা স্ট্রেস, ক্ষুধা, বিপাকক্রিয়া ও সামগ্রিক সুস্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত। ঘুমের অভাব এই হরমোনগুলোর ভারসাম্য নষ্ট করে, যা স্থূলতা, ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

৪. মানসিক স্থিতি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ

ঘুম আবেগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ঘুমের ঘাটতি বিরক্তি, আবেগপ্রবণতা ও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। পর্যাপ্ত ঘুম উদ্বেগ কমায় এবং বিষণ্নতার ঝুঁকি হ্রাস করে।

৫. সৃজনশীলতা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি

পর্যাপ্ত বিশ্রামপ্রাপ্ত মস্তিষ্ক নতুন ধারণা তৈরি করতে সক্ষম হয়। ঘুমের সময় মস্তিষ্কে নতুন স্নায়ুবন্ধন তৈরি হয়, যা সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী চিন্তা এবং কর্মক্ষমতা বাড়ায়।

ঘুমের মান উন্নত করার উপায়

১. নিয়মিত ঘুমের সময়সূচি

প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও জাগ্রত হওয়া দেহের জৈবিক ঘড়িকে স্থিতিশীল রাখে, ফলে স্বাভাবিকভাবে ঘুম আসা সহজ হয়।

২. শান্তিপূর্ণ রাত্রিকালীন রুটিন

ঘুমের আগে বই পড়া, ধ্যান করা বা উষ্ণ স্নান নেওয়ার মতো শান্তিময় অভ্যাস গড়ে তুলুন। টিভি, মোবাইল বা কাজের চাপ এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলো মেলাটোনিন উৎপাদন ব্যাহত করে।

৩. ঘুমের উপযোগী পরিবেশ তৈরি

শোবার ঘর যেন অন্ধকার, নীরব ও আরামদায়ক তাপমাত্রায় থাকে। ব্ল্যাকআউট পর্দা, আই মাস্ক বা হোয়াইট নয়েজ ব্যবহার করতে পারেন। আরামদায়ক গদি ও বালিশও ঘুমের মান বাড়ায়।

৪. উত্তেজক খাবার ও পানীয় এড়িয়ে চলা

ক্যাফেইন, নিকোটিন, অ্যালকোহল এবং ভারী খাবার ঘুম ব্যাহত করতে পারে। ঘুমানোর অন্তত তিন ঘণ্টা আগে এগুলো এড়িয়ে চলা উচিত।

৫. নিয়মিত ব্যায়াম

শারীরিক ব্যায়াম স্ট্রেস কমায়, রক্তসঞ্চালন বাড়ায় এবং দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে—যা ঘুমকে সহজ করে। তবে ঘুমানোর ঠিক আগে ব্যায়াম না করাই ভালো।

ঘুম সুস্বাস্থ্য ও কর্মক্ষমতার এক অপরিহার্য স্তম্ভ। নিয়মিত ঘুমের সময়সূচি বজায় রাখা, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করা, উত্তেজক খাবার এড়ানো এবং মানসিক প্রশান্তির অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে ঘুমের মান উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত করা যায়। বিশ্রামপ্রাপ্ত দেহ ও মন মনোযোগ, সৃজনশীলতা এবং মানসিক দৃঢ়তা বাড়ায়, যা প্রতিদিনের জীবনকে আরও ফলপ্রসূ ও পরিপূর্ণ করে তোলে।